Saturday, July 27, 2019

আমার হজ্জ কবুল হচ্ছে তো?


কাউকে কটাক্ষ করার উদ্দেশ্যে নয় বরং সাবধান করার জন্যই আজকের এই পোষ্ট। অনেকেই আজকাল হজ্জে যাবার সময় বা কাবার সামনে দাড়িয়ে নিজের ছবি তুলে ফেসবুকে শেয়ার করেন! অথবা ফেসবুকে হজ্জে যাবার ঘোষণা দেন। একবারও কি ভেবে দেখেছেন যে, এসব করার কারনে যদি হজ্জ কবুল না হয় তাহলে?

প্রত্যেক মুসলিমের অন্তরেই হজ্জ পালনের ইচ্ছা থাকে কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য সবার থাকে না। আল্লাহ যাদেরকে হজ্জ পালনের সামর্থ্য ও সুযোগ দিয়েছেন তাদের জন্য এটা অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হালাল অর্থে ও যথাযথ নিয়মে হজ্জ পালন করলে অর্থাৎ মাবরুর হজ্জের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। আফসোসের বিষয় হচ্ছে এমন সুযোগ পেয়েও আজকাল অনেকে নিজেদের হজ্জের মত এত বড় আমলকে বরবাদ করে দিচ্ছেন নিজেরাই।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে এখানে আলোচনা করছি যেন একজন হলেও এই ধরনের ফিতনা থেকে বাঁচতে পারেন আর নিজের আমলের হেফাযত করতে পারেন। 

গোপন শির্ক কি?
এ প্রকার শির্কের স্থান হলো ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়্যাতের মধ্যে। যেমন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কোন কাজ করে তা দ্বারা মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করা। 

মাহমূদ বিন লাবীদ (রাঃ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একদা স্বগৃহ হতে) বের হয়ে বললেন, হে মানবমণ্ডলী! তোমরা গুপ্ত শির্ক হতে সাবধান হও। সকলে বলল, হে আল্লাহর রসূল! গুপ্ত শির্ক কী? তিনি বললেন, মানুষ নামায পড়তে দাঁড়িয়ে তার নামাযকে চেষ্টার সাথে সুশোভিত করে (সুন্দর করে পড়ে); এই কারণে যে, লোকেরা তার প্রতি দৃক্‌পাত করে দেখে তাই। এটাই (লোকেদের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে নামায পড়া) হল গুপ্ত শির্ক। [হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী), অধ্যায়ঃ ৩/ নিয়্যাত, হাদিস নম্বরঃ ১৭৪]

মাহমূদ বিন লাবীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের উপর আমার সবচেয়ে অধিক যে জিনিসের ভয় হয় তা হল ছোট শির্ক। সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রসূল! ছোট শির্ক কী জিনিস? উত্তরে তিনি বললেন, রিয়া (লোকপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আমল)। আল্লাহ আযযা অজাল্ল যখন (কিয়ামতে) লোকেদের আমলসমূহের বদলা দান করবেন তখন সকলের উদ্দেশ্যে বলবেন, তোমরা তাদের নিকট যাও, যাদেরকে প্রদর্শন করে দুনিয়াতে তোমরা আমল করেছিলে। অতঃপর দেখ, তাদের নিকট কোন প্রতিদান পাও কি না! [হাদীস সম্ভার (ওয়াহীদিয়া ইসলামিয়া লাইব্রেরী), অধ্যায়ঃ ৩/ নিয়্যাত, হাদিস নম্বরঃ ১৭৫]

হজ্জ ফরয হওয়া ও হাজ্জে মাবরুর বা কবূলকৃত হাজ্জের ফাযীলাতঃ

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বাইতুল্লাহর হাজ্জ করা ফরয যারা সেথায় যাওয়ার সামর্থ্য রাখে এবং কেউ প্রত্যাখ্যান করলে সে জেনে রাখুক আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষীহীন। [সূরা আল-ইমরান/৩, আয়াতঃ৯৭]

আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হাজ্জ হতে ফিরে আসবে যেদিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল। [সহীহ বুখারী (তাওহীদ), অধ্যায়ঃ ২৫/ হাজ্জ, হাদিস নম্বরঃ ১৫২১]

মাবরুর হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ভিন্ন অন্য কিছু নয়।  [বোখারি : হাদিস নং ১৬৫০]

ইবাদতে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করাঃ
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
আমি জিন এবং মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি। [সূরা আয-যারিয়াত/৫১, আয়াতঃ৫৬]

তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। আর তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না। [সূরা আন-নিসা/৪, আয়াতঃ৩৬]

অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। [সূরা আল-কাহফ/১৮, আয়াতঃ১১০]

নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল। [সূরা আন-নিসা/৪, আয়াতঃ৪৮]

লোক দেখানো ইবাদতের শাস্তিঃ
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
হে ঈমানদারগণ! দানের কথা প্রচার করে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে নষ্ট করে দিয়ো না ঐ লোকের মত যে নিজের ধন লোক দেখানোর জন্য ব্যয় করে। [সূরা বাকারা/২, আয়াতঃ২৬৪] 

আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন তিনি রাসুল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক ব্যক্তির ব্যপারে ফয়সালা হবে যে শহীদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে এবং তাকে যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল তা পেশ করা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, ‘আমি যে সমস্ত নিয়ামত তোমাকে দিয়েছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কি কাজ করেছ?’ সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করে শহীদ হয়েছি। তিনি বলবেনঃ তুমি মিথ্যা ...বলছ। বরং তুমি এজন্য লড়াই করেছ যে, লোকেরা তোমাকে বীর বাহাদুর বলবে! আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, সে ইলম অর্জন করেছে, তা লোকদের শিক্ষা দিয়েছে আর কুরআন পাঠ করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। তুমি তোমার নিয়ামতের কি সদ্ব্যাবহার করেছ? সে বলবে আমি ইলম অর্জন করেছি, লোকদের তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে বিদ্যা অর্জন করেছিলে যে, লোকেরা তোমাকে আলেম না বিদ্বান বলবে, এবং কুরআন এই জন্য পাঠ করেছিলে যে, তোমাকে ক্বারীবলা হবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে আনা হবে, তাকে আল্লাহ অজস্র ধন দৌলত দান করেছেন এবং নানা প্রকারের ধন সম্পদ দিয়েছেন। তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার এ সম্পদ দ্বারা তুমি কি কাজ করেছ? সে বলবে, যেখানে ব্যায় করলে আপনি সন্তুশ্ত হবেন এমন কোন খাত আমি বাদ দেইনি বরং সেখানেই খরচ করেছি আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই জন্য দান করেছ যে, লোকেরা তোমাকে দাতা বলবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [রিয়াযুস স্বা-লিহীন (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়ঃ ১৮/ নিষিদ্ধ বিষয়াবলী, হাদিস নম্বরঃ ১৬২৫, সহীহ মুসলিমঃ ১৯০৫]

আসুন, সময় থাকতে আমরা সাবধান হই। আল্লাহ তাআলা আমাদের ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেন। আমীন।

No comments:

Post a Comment